গভীর শোক বুকে ধারণ করে দেশের জন্য কাজ করছি :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শোকের ব্যথা বুকে নিয়েও দেশের সমৃদ্ধি আর মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। দেশের মানুষকে ভাল রাখারই আমার একমাত্র লক্ষ্য। জনগণ যেন শান্তি এবং উন্নত জীবন লাভ করতে পারে। গত সাড়ে নয় বছরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের যে উন্নয়ন করেছে, তার খবর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নেতাকর্মীদের যার যার এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। পবিত্র ইদুল আজহার দিন বুধবার সকালে গণভবনে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, জনগণ যদি ভোট দেয় তাহলে আমরা ক্ষমতায় যাব। তারা খুশি হলে ভোট  দেবে, না দিলে নেই। কোনো অসুবিধা নেই। উন্নয়ন কর্মকান্ডে জনগণ সন্তুষ্ট হয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিলে, আবারো নৌকা ক্ষমতায় আসবে।

বরাবরের মতো এবারও ঈদের দিন গণভবনের এ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাসহ সর্বস্তরের নাগরিক এবং ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও উচ্চ আদালতের বিচারকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। জাতির পিতাকে হারানোর শোকের এই মাসে পরিবারের সবার জন্য দোয়া চেয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা হাসিনা বলেন, ‘১৫ অগাস্ট আমরা মা-বাবা, ভাই-বোন সকলকে হারিয়েছি। আমরা দুটি বোন বেঁচে আছি। আপনারা ১৫ অগাস্ট ও ২১ অগাস্টের শহীদদের প্রতি দোয়া করবেন। আমাদের দুই বোনের জন্য দোয়া করবেন, আমাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য দোয়া করবেন।’

প্রতি বছর দুই ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে সামনে পাওয়া যায় বলে অনেকেই এ সময় বিভিন্ন অভাব অভিযোগের কথা তার কাছে তুলে ধরেন। তাতে সময়ক্ষেপণ হয় বলে এবারের ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ের অনুষ্ঠানে আলাদা টেবিলের ব্যবস্থা করা হয় অভাব অভিযোগ শোনার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় মহৎ কিছু অর্জনের জন্য দলের নেতা-কর্মীদের ত্যাগ শিকারে প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, পবিত্র ঈদুল আযহা আমাদের সেই ত্যাগেরই শিক্ষা দেয়। ‘মহৎ কিছু অর্জনের জন্য মহান ত্যাগের প্রয়োজন’ বঙ্গবন্ধুর এই উদ্ধৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি সবসময়ই বঙ্গবন্ধুর এই দর্শনকে সঠিক বলে মনে করি।

দলীয় নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর প্রধান বিচারপতিসহ উচ্চ আদালতের বিচারক এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। শুরুতে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীকে ফুলের তোড়া দিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধাগণ, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার এবং ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং ভিক্ষুক ও হতদরিদ্র মানুষসহ সাধারণ জনগণকে এদিন প্রধানমন্ত্রী ঈদের শুভেচ্ছা জানান।

বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানগণ, দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা এবং তারেক ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলায় সরাসরি জড়িত

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আবারো তৎকালীন বিএনপি সরকারকে অভিযুক্ত করে বলেছেন, এ হত্যাযজ্ঞে খালেদা জিয়া এবং তার সন্তান তারেক রহমান সরাসরি জড়িত। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। গত মঙ্গলবার সকালে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় হতাহতদের স্মরণে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আয়োজিত এক সমাবেশে এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের যে কোন সমাবেশের নিরাপত্তা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবক এবং ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তারা সাধারণত পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে এ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ওই দিন তাদের (স্বেচ্ছাসেবকদের) সমাবেশের আশেপাশের কোন ভবনের ছাদে থাকার অনুমতি দেয়া হয়নি। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, কারা এ হামলায় জড়িত। তিনি বলেন, হামলার সময় সেখানে উপস্থিত সেনা গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য তাত্ক্ষণিকভাবে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে ফোন করে এখানে কি হচ্ছে জানতে চাইলে তাকে ধমক দিয়ে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা একটু সাহায্য করতে চেয়েছে তাদের সরকার ও বিএনপি’র পক্ষ থেকে তিরস্কার করে সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। হতাহতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে পুলিশ বরং যারা সাহায্য করতে এসেছিল তাদের ওপর বেধড়ক লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে খুনীদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সারাদেশে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বোমা সন্ত্রাস এবং ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। সে হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং ৫ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মানব ঢাল রচনায় শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের শব্দে তাঁর শ্রবণ শক্তিতে মারাত্মক সমস্যা হয়।

শেখ হাসিনা এদিন সমাবেশস্থলে এসেই প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শহীদদের স্মরণে নির্মিত অস্থায়ী বেদীতে পুুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শহীদদের বেদীতে শ্রদ্ধা জানান। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ এবং ১৪-দলীয় জোট  নেতৃবৃন্দ, ২১ আগস্টে নিহতদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন এবং সেদিন যারা আহত হন তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এতগুলো মানুষ হতাহত হলো কিন্তু সেটা নিয়ে সংসদে সে সময় কোন কথা বলতে দেওয়া হয়নি। কেউ কথা বলতে গেলেই মাইক বন্ধ করে দেয় আর সেটা নিয়ে নির্মম ব্যঙ্গোক্তি এবং হাসি-তামাশা-ঠাট্টা করে। কোন শোক প্রস্তাবও আনতে দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘এমনও অপপ্রচার চালানো হয় এমনকি সংসদেও বলা হয়েছে, আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড এনে এই হামলা চালিয়েছি।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় খালেদা জিয়া এবং বিএনপি নেতাদের দেয়া বক্তব্যগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এর কয়দিন আগেই খালেদা জিয়া এবং বিএনপি বলেছিল হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা বিরোধী দলের নেতাও হতে পারবে না। আর আওয়ামী লীগ আগামী একশ’ বছরেও ক্ষমতায় যেতে পারবে না।’ তিনি বলেন, এসব কথা বলার কারণ আওয়ামী লীগকে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করাই ছিল তাদের পূর্বপরিকল্পনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন ঘটনা সংঘটিত হবার পর থেকেই এর আলামত ধ্বংসের একটি প্রচেষ্টা বিএনপি-জামায়াতের ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহূত যে আর্জেজ গ্রেনেড সেদিন ছোঁড়া হয়েছিল তার মধ্যে একটি গ্রেনেড ফোটেনি সেটিও সংরক্ষণ করা হয়নি। সিটি কর্পোরেশন থেকে পানির গাড়ি এনে ত্বরিত ঘটনাস্থল ধোঁয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় এবং গ্রামের এক লোককে ধরে এনে তাকে দোষী সাজিয়ে ‘জজ মিয়া নাটক’ মঞ্চস্থ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *