খলিশা মাছের পোনা উৎপাদনে সাফলতা অর্জন

কবি রোকনুজ্জামান খান তাঁর ‘হাসি’ কবিতায় লিখেছেন, কাজল বিলে শাপলা হাসে, হাসে সবুজ ঘাস/ খলশে মাছের হাসি দেখে, হাসে পাতিহাঁস। কবি খলশে মাছের মধ্যেও অবিরাম আনন্দধারার মাধুর্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন। এবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে খলিশা মাছের পোনা উৎপাদনে সাফলতা অর্জন করেছেন।

ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইনস্টিটিউটের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর স্বাদু পানি উপকেন্দ্র থেকে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। গবেষক হিসেবে ছিলেন উপকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খোন্দকার রাশিদুল হাসান ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শওকত আহমেদ। খলিশার বৈজ্ঞানিক নাম  Colisa fasciatus। প্রাকৃতিকভাবে এ প্রজাতিটি বাংলাদেশসহ, ভারত, নেপাল ও মিয়ানমারে পাওয়া যায়। মিঠা পানির জলাশয়ে, বিশেষ করে পুকুর, নদী, ঝরনাসহ খাল-বিলে একসময় এ মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। শস্যক্ষেতে কীটনাশকের যথেচ্ছ প্রয়োগ, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ, জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা, কলকারখানার বর্জ্য নিঃসরণসহ নানা কারণে বাসস্থান ও প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় এ মাছের প্রাচুর্যতা হ্রাস পেয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে ও চাষের জন্য পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে খলিশার কৃত্রিম প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন করা জরুরি হয়ে পড়ে। ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্বাদু পানি উপকেন্দ্র, সৈয়দপুর প্রাকৃতিক উৎস থেকে খলিশা মাছ সংগ্রহ করে পুকুরে ব্রুড প্রতিপালন, ডিম ধারণক্ষমতা নির্ণয়, সঠিক প্রজননকাল চিহ্নিতকরণসহ অন্যান্য গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পুকুরে ৮-১০ সেন্টিমিটার (১৫-২০ গ্রামের) খলিশা মাছ পরিপক্ব হয়ে থাকে। মাছটির বয়স, আকার ও ওজন আনুপাতে ডিম ধারণক্ষমতা ৫-১৩ হাজার। এর প্রজননকাল মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এসব তথ্যের ভিত্তিতে উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে গত ১২ জুলাই মাছটির কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনের কলাকৌশল উদ্ভাবনে সফল হন।

গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রজনন মৌসুমের আগেই প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ সংগ্রহ করে উপকেন্দ্রের পুকুরে ব্রুড তৈরির জন্য প্রতিপালন করা হয়। প্রজনন মৌসুমে পরিপক্ব স্ত্রী ও পুরুষ মাছ পুকুর থেকে সংগ্রহ করে হ্যাচারি ট্যাংকে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা রাখা হয়। পরে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগের ১৩-১৫ ঘণ্টা পর মা খলিশা ডিম দেয়। এর ২০-২২ ঘণ্টা পর ডিম থেকে রেণু পোনা উৎপন্ন হয়। এ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে খলিশা মাছ চাষের ক্ষেত্রে পোনা পাওয়া সহজতর হবে। এ প্রজাতির মাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, এ ইনস্টিটিউট থেকে এরই মধ্যে ১৮টি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদের কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাবদা, গুলশা, টেংরা, মহাশোল ইত্যাদি। এসব প্রজাতির মাছ এখন বাজারে প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে। এসব মাছের ক্রয়মূল্যও সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে আছে। খলিশা মাছের ক্ষেত্রেও তা সম্ভব হবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *